গল্পে চলে যাই
✳ আমার শৈশব
নীতিগল্প৪ মিনিট পড়া০ বার পড়া হয়েছে

সৎ কাঠুরে ও তিনটি কুঠার

নদীতে হারাল লোহার কুঠার। সামনে এল সোনা আর রুপা—কাঠুরে কোনটি নেবে?

এই গল্পের শিক্ষা ↓

নদীর কাছের এক গ্রামে বাস করত এক কাঠুরে। প্রতিদিন শুকনো কাঠ কেটে বাজারে বিক্রি করত সে। তার ঘরে ধনসম্পদ ছিল না; পুরোনো একটি লোহার কুঠারই ছিল রোজগারের ভরসা। কাজ শেষে সে কুঠারটি যত্ন করে মুছে রাখত।

কাজে বের হওয়ার সময় ঘরের মানুষ তাকে ছোট একটি খাবারের পুঁটলি দিত। কাঠুরে সেটি গাছের ছায়ায় রেখে কাজে নামত। শুকনো ডাল বেছে নেওয়া, কাঠ বেঁধে বাজারে নেওয়া—প্রতিটি কাজে সময় লাগত। তার কুঠারের ধার খুব নতুন ছিল না, কিন্তু হাতলটি ছিল হাতের সঙ্গে চেনা বন্ধুর মতো মানানসই।

এক দুপুরে নদীর ধারে কাজ করার সময় হাত ফসকে কুঠারটি পানিতে পড়ে গেল। গভীর জলে সেটি আর দেখা গেল না। কাঠুরে তীরে বসে পড়ল। কুঠার ছাড়া কাল কাজে যাবে কীভাবে? ধার করার মতো টাকাও তার নেই। নদীর স্রোতের দিকে তাকিয়ে তার চোখ ভরে এল।

সে তীরে নেমে খুঁজতে চাইল, কিন্তু পানি ঘোলা আর পাড় পিচ্ছিল। নিজের সামর্থ্য বুঝে আর এগোল না। একটি জিনিস হারানোর কষ্টে নিজের জীবন বিপদে ফেলা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। অসহায় হয়ে বসে রইল সে। মাথায় তখন ঘুরছে পরের দিনের বাজার, ঘরের খাবার আর থেমে যাওয়া কাজের চিন্তা।

গল্পে তখন নদী থেকে আবির্ভূত হলেন এক দেবতা। তিনি কাঠুরের দুঃখের কথা শুনলেন। কিছুক্ষণ পর পানি থেকে একটি সোনার কুঠার তুলে জিজ্ঞেস করলেন, এটি কি তার? ঝকঝকে কুঠারটি দেখে কাঠুরে অবাক হলো। কিন্তু মাথা নেড়ে জানাল, তার কুঠারটি লোহার।

সোনার উজ্জ্বলতা তার চোখ এড়ায়নি। এক মুহূর্তের জন্য অভাবের ঘরটির কথা মনে হলো। তবু যে জিনিস কখনো তার ছিল না, সেটিকে নিজের বলা যায় কীভাবে? সে ভাবল, আজ মিথ্যা বলে কিছু পাওয়া গেলেও কাল নিজের মনে সেই কথা থেকে যাবে। তাই স্পষ্ট করে সত্য কথাটিই বলল।

দেবতা এবার একটি রুপার কুঠার আনলেন। কাঠুরে আবারও বলল, সেটি তার নয়। সোনা কিংবা রুপা পেলে অভাব অনেকটাই মিটত। তবু অন্যের জিনিস নিজের বলে নেওয়ার কথা তার মনে সায় দিল না। শেষবার দেবতা জলের নিচ থেকে তার চেনা লোহার কুঠারটি তুলে আনলেন।

পরপর দুবার দামি কুঠার ফিরিয়ে দেওয়ার পরও কাঠুরে কোনো পুরস্কার চাইছিল না। তার প্রার্থনা ছিল খুব সামান্য—নিজের কাজটি আবার শুরু করতে পারা। দেবতার প্রশ্নের উত্তরে তাই বড় বক্তৃতা নয়, সে শুধু নিজের হারানো কুঠারটির কথা বলছিল। সত্য বলার জন্য আলাদা সাজানো গল্পের প্রয়োজন হয়নি তার।

এবার কাঠুরের মুখে হাসি ফুটল। হাতলের পুরোনো দাগ দেখে সে নিজের জিনিস চিনল। দেবতা তার সততায় খুশি হয়ে তিনটি কুঠারই উপহার দিলেন। কাঠুরে কৃতজ্ঞ মনে বাড়ি ফিরল। তার আনন্দের বড় কারণ ছিল হারানো কাজের সঙ্গীটিকে ফিরে পাওয়া।

বাড়ি ফিরে সে প্রথমে পুরোনো কুঠারটির হাতল মুছে রাখল। পরিবারের মানুষ ঘটনাটি শুনে অবাক হলো। কাঠুরে তাদের বলল, উপহার পাওয়া আনন্দের, কিন্তু সততা শুধু উপহার পাওয়ার জন্য করা যায় না। লোহার কুঠারটি ছাড়া আর কিছু ফিরে না পেলেও তার উত্তর একই থাকত।

এই খবর শুনে এক লোভী মানুষ নিজের কুঠার ইচ্ছে করে নদীতে ফেলল। সোনার কুঠার দেখানো মাত্রই সে নিজের বলে দাবি করল। তার মিথ্যা ধরা পড়ল; উপহার তো পেলই না, নিজের কুঠারও হারাল। সততার গল্পটিকে সে শুধু ধনী হওয়ার কৌশল ভেবেছিল।

এই গল্পের শিক্ষা

সুযোগ যত লোভনীয়ই হোক, নিজের নয় এমন জিনিস দাবি করা উচিত নয়।

একটু ভেবে দেখি

কেউ না দেখলেও সঠিক কাজটি করা কেন জরুরি?

প্রচলিত সৎ কাঠুরের নীতিগল্পের নিজস্ব বাংলা পুনর্কথন।

গল্পের পাতায় অন্তত ১০ সেকেন্ড থাকলে পড়া হিসেবে গণনা হয়। একই ব্রাউজারে ৩০ মিনিটে একবার। এই ফিচার চালুর পর থেকে হিসাব।